রুপান্তর নিউজ রুপান্তর নিউজ
Admin
দুর্যোগ ও সংকটে রাষ্ট্র এবং নাগরিকের অগ্রাধিকার সবার আগে


প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় দেখে আসে না। বন্যার পানি যেমন বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দলের সমর্থকের বাড়ি আলাদা করে ডুবিয়ে দেয় না, তেমনি দুর্ভোগও সবাইকে সমানভাবে স্পর্শ করে। তাই এমন সংকটে রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা হয়ে ওঠে জনআস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে, টানা বর্ষণ ও বন্যায় লাখো মানুষ পানিবন্দী ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমন সময়ে পানি সম্পদমন্ত্রী জনাব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির বিদেশ সফর নিয়ে জনপরিসরে প্রশ্ন ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল খেলা দেখতে গেছেন। এই অভিযোগের সত্যতা ও সফরের সরকারি প্রেক্ষাপট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের প্রশ্নের জবাব দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
একজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন, অবকাশ কিংবা পারিবারিক সময় কাটানোর অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার কখন এবং কী প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটিই জনমতের মূল বিষয়। যখন একটি অঞ্চল বন্যায় বিপর্যস্ত, মানুষ আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও উদ্ধার সহায়তার অপেক্ষায়, তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তির শারীরিক উপস্থিতি, সক্রিয় তদারকি এবং দৃশ্যমান নেতৃত্ব জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দূর থেকে নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হলেও সংকটের সময় মাঠে উপস্থিত নেতৃত্বের প্রতীকী ও বাস্তব গুরুত্ব কখনোই কমে না।
এখানে প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি নিয়ে। আজ যে দল ক্ষমতায় আছে, আগামীকাল অন্য দলও থাকতে পারে। কিন্তু একটি নীতি সবার জন্য সমান হওয়া উচিত-
দুর্যোগের সময় রাস্ট্র ও জনগণই হবে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যে নীতি আজ অন্যের ক্ষেত্রে দাবি করা হবে, আগামীকাল নিজের ক্ষেত্রেও সেটিই অনুসরণ করতে হবে। এটাই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সৌন্দর্য।
বাংলাদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, দুর্যোগে তারা একে অপরের পাশে দাঁড়াতে জানে। এখন জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের নেতৃত্বও একই সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করবে। একজন মন্ত্রীর প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়, নৈতিক বার্তাও বহন করে। সেই বার্তা যদি জনগণের কষ্টের সময় সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও উপস্থিতির হয়, তবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হয়। আর যদি সেই বার্তা বিভ্রান্তি বা প্রশ্নের জন্ম দেয়, তবে তার ব্যাখ্যা দেওয়াও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অংশ।
গণতন্ত্রে সমালোচনা শত্রুতা নয়; বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি অপরিহার্য উপায়। তাই বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগের এই সময়ে সরকারের উচিত জনমনে সৃষ্টি হওয়া প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া এবং একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান ও কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মনে রাখে না কে কোন দলের ছিল; ইতিহাস মনে রাখে, সংকটের দিনে জনগণের পাশে কে দাঁড়িয়েছিল।
সাঈদ মুহাম্মদ আজিজ
লেখক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কুষ্টিয়া

